Loading...
You are here:  Home  >  ধর্ম-দর্শন  >  Current Article

বর্ষবরণ উত্সব : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মুহাম্মদ আনসারুল্লাহ হাসান: আর কয়েক দিন পর প্রতিবারের মতো আরেকটি বছর শেষ হয়ে নতুন একটি বছর শুরু হতে যাচ্ছে, সমাপ্তি ও সূচনার পৌনঃপুনিক ধারায় মানুষের জীবন থেকে অমূল্য একটি বছর, হায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহর দেয়া ‘সময় সম্পদের’ একটা দীর্ঘ পরিধি অতীতের গর্ভে বিলীন হতে চলেছে। এভাবে রাত-দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর বিদায় নিতে নিতে এক সময় প্রত্যেক মানুষের জীবনে প্রতিভাত হবে চিরবিদায়ের সেই অমোঘ-অপরিবর্তনীয় মুহূর্ত, যা আল্লাহতায়ালা নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই বছরের প্রস্থান ও আগমনে- প্রত্যেক বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কর্তব্য হলো অতীত জীবন নিয়ে চিন্তা করা তথা আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনার মাধ্যমে জীবনের হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করা। অর্থাত্ অতীত হওয়া বছরটাতে যতটুকু সময় আল্লাহতায়ালার মর্জি মোতাবেক চলার তাওফিক হয়েছে, তার শোকর আদায় করা এবং যত সময় অন্যায়-অপরাধ, গাফিলত-উদাসীনতা এবং আল্লাহর নাফরমানিতে বরবাদ হয়েছে তার জন্য অন্তর থেকে অনুশোচনা করা, যদিও এটা মুমিনের প্রাত্যহিক কাজ। তবু ভালো-মন্দের হিসাব গ্রহণ ও ভবিষ্যত্ জীবনে নতুন সংকল্প, সুন্দরতার পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এটা অনিবার্য, প্রতিটি রাত্রি-দিবস, সপ্তাহ, মাস, বছরের আগমন ও প্রস্থান এই হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন করে। কোরআন মাজিদে এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা তাগিদ দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে তিনি সেই সত্তা যিনি দিন ও রাতকে পরস্পরের অনুগামী করে সৃষ্টি করেছেন। (কিন্তু এসব বিষয় উপকারে আসে কেবল) সেই ব্যক্তির জন্য যে উপদেশ গ্রহণ করতে ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়। [সূরা ফুরকান : ৬২]
কিন্তু আমরা কেউ বিদায়ী দিনগুলোর কথা ভাবি না। অতীত বছরের হিসাব-নিকাশ করি না, জীবনে সকল অঙ্গনে যেমন আমরা অতীতকে ভুলে যাই, তেমনি ভবিষ্যত্ সম্পর্কেও উদাসীন থাকি। ফলে আমাদের চলমান জীবনও কখনো ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে না। অথচ নতুন বছরকে সুন্দর, উন্নত ও সমৃদ্ধ করার জন্যই অতীত জীবনের হিসাব-নিকাশ করা জরুরি। ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের জন্যই আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনা প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে এই উচিত ও প্রয়োজনীয় কাজের পরিবর্তে অনুচিত কর্ম ও আত্মবিস্মৃতির আচরণই বেশি দেখা যায়। অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করা এবং আত্মবিস্মৃতির কারণে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে আয়োজন করছি নানারকম অনুষ্ঠানের। কি সেই অনুষ্ঠানের চিত্র ও অবয়ব? বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে যে কুরুচিপূর্ণ উল্লাস ও উন্মাদনার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে তা একটি মুসলিম জাতি ও সমাজের জন্য কত অশুভ ও ধ্বংসাত্মক তা কি ভেবে দেখছি আমরা?
৩১ ডিসেম্বর রাতে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ‘থার্টি ফাস্ট নাইট’ উদযাপনের নামে দেশের শহর-বন্দরগুলোতে জমে উঠে উদ্দাম নাচ-গানের আসর, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার কুিসত রূপ, তারুণ্যের উন্মাদনার নামে তরুণ-তরুণীরা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়ায় হোটেল-রেস্তোরাঁ, পার্ক-উদ্যান ও নাইট ক্লাব ইত্যাদিতে। সেখানে চলে নানা উচ্ছৃঙ্খলা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও পাপাচারের অসংখ্য আয়োজন। ঘটে বহু অপ্রীতিকর ঘটনাও। পরদিন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তার কিছু সচিত্র সংবাদ থেকে অনুমান করা যায় অন্তরালের অশ্লীলতার বিস্তার কত মারাত্মক পর্যায়ের। দেশের নাইট ক্লাব ও অভিজাত হোটেলগুলোতে চলে প্রকাশ্য মদ্যপানের আসর। তরুণ-তরুণীদের প্রলুব্ধ করার জন্য দেয়া হয় নানারকম আকর্ষণীয় অফার। থাকে বিশেষ বিশেষ আয়োজন। ফলে নর-নারীর পঙ্কিলতা ও মদের মাতাল নেশায় বুঁদ হয়ে উঠে ‘থার্টি ফাস্ট নাইটে’র আবরণে বছরের প্রথম রাত্রি। এটাকে ‘বর্ষবরণ উত্সব’ না বলে বলা উচিত বছরের শ্রেষ্ঠ অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার উত্সব। যে জাতি ও সমাজ তাদের বছরের প্রথম রাত্রি-দিনে এরকম জঘন্য পাপাচার ও কদর্য অশ্লীলতায় মেতে উঠে, তাদের জন্য বাকি দিনগুলো কত সুফল ও কল্যাণ বয়ে আনবে তা তো সহজেই বোধগম্য হয়। এদেশের কুলকলঙ্ক বুদ্ধিজীবী ও সমাজপতিদের উস্কানি এবং আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এমন জঘন্য নোংরা কালচার ও পশ্চিমা ব্লু জগতের সংস্কৃতি বিগত দেড় দশক যাবত বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে। যারা এদেশের শালীন ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি, সামাজিক ও পারিবারিক আবহকে ধ্বংস করতে সদা উন্মুখ, যাকে, একটি মুসলিম দেশ হিসেবে এদেশের সাধারণ মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কি হতে পারে যে, তাদের সন্তানরা এমন চরিত্র বিধ্বংসী কর্ম ও বিজাতীয় উত্সবে মেতে ওঠে? নিলজ্জতায় ভেসে যাবে? যে পশ্চিমা সভ্যতা-সংস্কৃতি বিশ্বমানবতাকে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা ছাড়া আর কিছু দিতে পারেনি। যে কৃষ্টি-কালচার মানবতার জন্য অভিশাপ ও অনাচার ব্যতীত আর কিছু বয়ে আনতে পারেনি। আমরা কি তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিই গ্রহণ করছি? জেনে-বুঝে বিষপান করার মতো তাদের জীবনাচার গ্রহণ করে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে ইরশাদ করেছেন, হে মুসলিমগণ! তোমরা ঐ জালেমদের দিকে একটু ঝুঁকবে না, অন্যথায় কখনো জাহান্নামের আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে। [সূরা হুদ, -১১৩]
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বায়যবী রহঃ বলেন, তোমরা তাদের প্রতি সামান্যতমও ঝুঁকে পড়বে না। যেমন তাদের পোশাকের সৌন্দর্য গ্রহণ করা, তাদের চাল-চলন জীবনাচার গ্রহণ করা এবং শ্রদ্ধাভরে তাদের নাম উল্লেখ করা। হজরত আবুল আলিয়া রহ. বলেন, তোমরা তাদের কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড গ্রহণ করবে না। তাফসীরে দুরবে মনসুর ৩:৬৩৬, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোনো বিজাতির সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহতায়ালা সমাজে অশ্লীলতার প্রচার প্রসারের বিরুদ্ধে কঠোরতা প্রদর্শন করে ইরশাদ করেছেন, যারা পছন্দ করে ঈমানদারদের মধ্যে ব্যাভিচারের অশ্লীলতার প্রসার হোক, তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। [সূরা নূর-২৬] আর এ সবই শয়তানের ষড়যন্ত্র মুসলিম জাতিকে ধ্বংস করার জন্য। তাই জিন শয়তানের পাশাপাশি মানুষ শয়তানের অনুসরণ করা কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ হবে না। যেমন আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে ব্যক্তি শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে তো অশ্লীলতা ও মন্দেরই নির্দেশ দেবে। [সূরা নূর-২৯]
তাই এক্ষেত্রে প্রত্যেক মুসলিম নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য হলো এ জাতীয় পাপাচার ও অশ্লীলতা বন্ধ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করা। আর মুসলিম দেশের মূল দায়িত্বশীল হিসেবে সরকারের কর্তব্য এই ধরনের নির্লজ্জ বেহায়াপনা, অশ্লীল কর্মকাণ্ড ও কুফরী উত্সব—অনুষ্ঠান কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা। আল্লাহতায়ালা সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

    Print       Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

You might also like...

পবিত্র শবেকদরের শিক্ষা

Read More →