Loading...
You are here:  Home  >  ধর্ম-দর্শন  >  Current Article

শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনের এজিদী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন

জুলফিকার আহমদ কিসমতী: যুগে যুগে সত্যাশ্রয়ী ও নীতিনিষ্ঠদের ভূমিকা একই ছিল। তারা যে মত ও পথকে সত্য জ্ঞান করেছেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই নীতি, মত ও পথের উপর অবিচল থেকেছেন। নীতির প্রশ্নে তারা যেমন কারও সঙ্গে আপোষ করতেন না, তেমনি কে বা কারা এবং কতসংখ্যক লোক তাদের সঙ্গে রয়েছে, সেদিকেও ভ্রূক্ষেপ করতেন না। আর এমনিভাবে একদিন দেখা যায়, কোনো সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় যেখানে মুষ্টিমেয় লোক কাজ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত সমাজের শত বাধা উপেক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল, পরবর্তী পর্যায়ে সেখানে গোটা সমাজ তাদের আদর্শের পতাকা হাতে এগিয়ে এসেছে। শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইনের সংগ্রামী জীবনেও আমরা এ সত্যের অভিব্যক্তি দেখতে পাই। তিনিই প্রথম ত্যাগী পুরুষ, যিনি মানুষের জন্যে নির্ধারিত ইসলামের হৃত গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এবং আল্লাহর দেয়া জীবন-বিধানকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার প্রাণসত্তা সহকারে অবিকৃত রাখার উদ্দেশ্যে নির্ভীকভাবে সংগ্রাম করে গেছেন। সত্যের ঝান্ডাকে উঁচু করে রাখার সংগ্রামে শত্রুশক্তির বিপুলসংখ্যাধিক্য, হামলার প্রচন্ডতা ও নির্মমতা তাকে এতটুকু নত করতে পারেনি। নিজের এবং প্রাণপ্রিয় মাসুম সন্তানদের বুকের রক্ত দিয়ে তিনি একথা প্রমাণ করে গেছেন যে, আল্লাহ প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় বিধানকে তার যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত রাখার প্রশ্নে ত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে কোনো মুসলমানের পক্ষে নিজের ও প্রাণপ্রিয় সন্তানদের জীবনাহুতির বিষয়টি অতি তুচ্ছ। কারণ, এরি মাধ্যমে প্রমাণিত হয় খোদাপ্রীতির প্রকৃত স্বরূপ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসলামী খেলাফতের নেতা বাছাইয়ের প্রশ্নে হক কথা না বলে চুপ থাকার নীতি করা হলে, ভবিষ্যতে ইসলামের দুর্যোগ মুহূর্তগুলোতে এর আওয়াজ বুলন্দ করার মতো নির্ভীক মুজাহিদের অভাব ঘটবে। স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে সত্যের পতাকা নিয়ে রুখে না দাঁড়ালে, মানুষ মুলত অনাগত দিনগুলোতে অত্যাচারীর সামনে হক কথা বলার সাহসী কোনো আদর্শ ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাবে না। মুলত একটি প্রতিষ্ঠিত রাজশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রবল ও জনবল শূন্য অবস্থায় কথা বলার পরিণতি কি হতে পারে, সংগ্রামী ইমাম তা ভাল করেই অনুধাবন করেছিলেন। এজন্যেই শুধু একটি বাক্য- ‘ইয়াজীদের আনুগত্য করি’ এই বলে কাপুরুষতা দেখাননি, দেখিয়েছেন ঈমানের প্রদীপ্ত শিখা। এছাড়া হোসাইন পরিবারের উন্নত নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিফহাল এমন কোনো মহল একথা বলতে পারবে না যে, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা কর্তৃত্ব হাসিলের জন্য তিনি এ পথে পা বাড়িয়েছিলেন। প্রথম খলীফা হযরত আবুবকর থেকে চতুর্থ খলীফা হযরত আলী পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসে এরূপ কোনো নজির নেই।
সাইয়েদুশ-শুহাদা ইমাম হোসাইন ৬২৫ খৃস্টাব্দে মহানবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর কন্যা ফাতেমা (রা.)-এর (৬০৫-৬৩৩) গর্ভে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা.) ছিলেন তার পিতা। মাতামহ মহামানব হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হোসাইনকে অপরিসীম স্নেহ করতেন। প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) হোসাইন ও তাঁর ভ্রাতা হাসানকে এতই ভালবাসতেন যে, তারা বাল্যাবস্থায় কোনো কোনো সময় হযরতের পবিত্র গ্রীবাদেশের ওপর চড়ে বসলেও তাতে তিনি বিরক্তিবোধ করতেন না। হযরত ইরশাদ করেছেন : ‘‘হাসান-হোসাইন আমার থেকে আমি হাসান হোসাইন থেকে।’’ মহানবী (সাঃ) তার কন্যা ফাতেমা (রা.) কে ডেকে বলতেন : হে ফাতেমা! হাসান হোসাইনকে কাঁদাবেনা না। এতে আমি মনে ব্যথা পাই। হে আল্লাহ! আমি হাসান-হোসাইনকে ভালবাসি, তুমিও তাদেরকে এবং তাদের প্রতি যারা ভালবাসা পোষণ করে তাদেরকে ভালবাস। হোসাইন এবং তার ভাইয়ের শিক্ষা-দীক্ষার কথা বলতে গেলে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, তিনি এবং তাঁর ভ্রাতা যে মহান শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ধর্ম, নৈতিকতা এবং রাজনীতি শিক্ষা লাভ করেছেন এবং যে ধরনের শিক্ষা অনুশীলন পরিবেশে দিবারাত্র লালিত পালিত ও বর্ধিত হয়েছেন, দুনিয়ার ইতিহাসে তার অপর কোনো নজির নেই এবং হবেও না। হযরত হোসাইনের শিক্ষক হযরত আলী (রা.) হচ্ছেন বিশ্বমানবের শিক্ষাগুরুর প্রধান ছাত্র। মাতা ফাতেমা ও অন্যতমা নানী আয়েশা (রা.) উক্ত গুরুর প্রধান ছাত্রীদ্বয়। সহপাঠীগণ দুনিয়ার সকল সহপাঠীর চাইতে শ্রেষ্ঠ চরিত্রবান, সহৃদয়, খোদাভীরু এবং স্নেহবাৎসল্যে পরিপূর্ণ আদর্শবান সহচর। এই অতুলনীয় শিক্ষা-পরিবেশে শিক্ষাপ্রাপ্ত, বিশেষ করে মাদরাসা-এ-নবুওয়াতের আল্লাহ প্রেরিত প্রধান অধ্যাপকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষালাভের পর একজন ছাত্রের চরিত্র ও জীবনধারা যা হওয়া উচিত, হযরত হোসাইনের জীবনের বহুবিধ বিক্ষিপ্ত ঘটনা ও সর্বশেষ তাঁর ত্যাগী জীবনের অমর রক্তাক্ত ইতিহাসই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
আধ্যাত্মিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ সুমহান চরিত্রের অধিকারী, জ্ঞান গভীর, অভিজ্ঞ ও খোদাপ্রেমিক সুশিক্ষিত আলী (রা) তার নয়নমনি হাসান-হোসাইনকে নিজে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
হযরত আলী (রা)র শাহাদাতের পর মুসলিম বিশ্বের একচ্ছত্র শাসন তখন হযরত আমীরে মোয়াবিয়া (রা)। তিনি বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন। তার পরে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষমতা কার হাতে হস্তান্তর করা যায়, তা নিয়ে ভাবছেন। অবশেষে নিজ সিদ্ধান্ত মতে আঞ্চলিক শাসকদের প্রতি পরবর্তী শাসক হিসেবে এজিদের জন্যে আনুগত্য আদায়ের নির্দেশ দিলেন। নিজে হজ্বের মওসুমে দামেস্ক থেকে এক হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কা-মদীনায় সফরে আসেন। উভয় স্থানের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ যেমন, ইমাম হোসাইন (রা), আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা), আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা) প্রমুখের কাছে উপরোক্ত প্রস্তাব রাখলেন। তাঁরা আমীর কর্তৃক স্বীয় পুত্রকে নিজের স্থলাভিষিক্তকরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা ৩টি প্রস্তাব রেখে বললেন, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে এর যেকোনো একটি আপনি গ্রহণ করুন।
১. শাসক নির্বাচনের ব্যাপারে মহানবী (সা) যে পন্থা অনুসরণ করেছিলেন, আপনি তাই করুন। তিনি কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যাননি, জাতির রায়ের উপর ব্যাপারটি ছেড়ে দিন।
২. অথবা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা)-এর পন্থা অনুসরণ করুন। পরামর্শের মাধ্যমে বনী উমাইয়া ব্যতীত কোরাইশদের মধ্য থেকে কোন যোগ্য লোককে মনোনীত করুন।
৩. কিংবা হযরত ফারুকে আযম (রা)-এর ন্যায় এ উদ্দেশ্যে একটি ‘লাজনাতুল মুনতাখেবা’ নির্বাচনী কমিটি গঠন করুন। আপনার পর এই কমিটি নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে খলীফা হিসেবে নির্বাচন করবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, উক্ত কমিটি অবশ্যই আপনার পুত্রকে বাদ দিয়ে গঠিত হতে হবে।’’ আমীরে মোয়াবিয়া তার জবাবে বললেন, এসব প্রস্তাব ছাড়া কি অপর কোনো প্রস্তাব উদ্ভাবন করা যায় না? ইবনে যুবায়ের উত্তরে বললেন, ‘‘না, তা হতে পারে না’’। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে সম্মানিত নেতৃবৃন্দের প্রস্তাব অনুমোদন লাভে ব্যর্থ হয়। আমীর মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে ইয়াজিদকেই মুসলিম জাহানের শাসকরূপে ঘোষণা করা হয়। মোয়াবিয়ার ইন্তিকালের পর তার নির্দেশ মোতাবেক ৬১ হিঃ মোতাবেক ৬৮০ খৃঃ এজিদ শাসন ক্ষমতা হাতে নেন এবং মদীনার বিদ্রোহী প্রধান নেতাদের নিকট হতে বশ্যতা আদায়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এজিদের ঔদ্ধত্য হোসাইনকে স্থির থাকতে দিল না। মুসলিম জনগণও ইয়াজিদের শাসন ক্ষমতা প্রাপ্তিতে বিচলিত হয়ে উঠলো। আমীর মোয়াবিয়া (রা)-এর জীবদ্দশায় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধে বড় ভ্রাতা ইমাম হাসান (রাঃ) তিরোধানের পর জনসমর্থনের ভিত্তিতে খলীফা নির্বাচনের উপর বিরোধ ফয়সালা করেছিলেন। তখন ইসলাম বাহ্যত এতটা বিপন্ন হবার আশংকা না থাকলেও এখন অবস্থা সম্পূর্ণ অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে।
এই সংকটময় মুহূর্তে এজিদের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে নিজের নিরাপত্তা চাইলে ইসলামের আদর্শকে বিসর্জন দিতে হয়। আর ইসলামের কল্যাণ চাইলে এজিদের শাসনকে অস্বীকার করতে হয়। ইমাম হোসাইন এই উভয় সংকটে পড়ে শেষোক্ত ত্যাগের পথই বেছে নিলেন। আর এরই শেষ পরিণতি হিসেবে (৬১ হিঃ ১০ই মুহাররম-মোতাবেক ৬৮০ খৃঃ) কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। অন্যথায শুধু ইসলামই আপন সত্তা হারাতো না, নবী বংশসহ দুনিয়ার সকল মুসলমান কলঙ্কিত হতো এবং শাহাদাতে কারবালার প্রেরণা নিয়ে যুগে যুগে যেসব ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছে, তাও হতো কিনা সন্দেহ।
ইমাম হোসাইনের দূরদর্শিতা : ইমাম হোসাইন তাঁর দূরদৃষ্টি দ্বারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এজিদ যেভাবে অগণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় এসেছেন, তার পরিচালিত পদ্ধতিতে খেলাফত স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কত্বমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তাতে গণতান্ত্রিক ইসলামী সমাজ সম্পূর্ণ ভ্রান্তপথে পরিচালিত হবে। ইসলামী রাষ্ট্র, সমাজ ব্যবস্থা এবং তার প্রাণশক্তিতে দেখা দিবে মূল আদর্শের পরিবর্তন ও বিকৃতি। মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের আপ্রাণ চেষ্টা ও ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবেশ করবে রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক স্বার্থপরতা, দেখা দিবে মানুষে মানুষে অসাম্য ও ভেদনীতি। বস্তুত মহাত্মা ইমাম যা আশঙ্কা করেছিলেন, পরবর্তীকালে তাই ঘটেছিল এবং এখনও তার জের চলছে। তাঁর আশঙ্কাসমূহ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বাস্তবে পরিণত হয়েছিল এবং নবুওয়ত পদ্ধতির শাসনব্যবস্থার ব্যতিক্রম ঘটেছিল, তার কতিপয় দৃষ্টান্ত নিম্নে প্রদত্ত হলো।
আল্লাহর রবুবিয়াত ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্র : ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অধিকারী হবেন আল্লাহ। জনগণ তার প্রজা। এই প্রজা পালনের ব্যাপারে রাষ্ট্রকে খোদার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালকের কর্তব্য হবে, নিজেরা আল্লাহর বিধানের পূর্ণ অনুসারী হবেন এবং জনজীবনকে সেই বিধান অনুসারে গড়ে তোলার সকল প্রকার ব্যবস্থা অবলম্বন করবেন; কিন্তু এজিদের হাতে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরি হওয়ায় দেখা গেল, মুসলিম সমাজে মানুষের কর্তৃত্বভিত্তিক রাজতন্ত্রের সূচনা হয়েছে এবং রাজতন্ত্রের চিরাচরিত ত্রুটি এবং স্বেচ্ছাচারী নীতিই তাতে অনুসৃত হয়েছে। ইসলামী আইন চালু থাকলেও বাদশা এবং তার পরিবার ও কর্মচারীরা রইলেন এর ঊর্ধ্বে।
ইসলামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য : ইসলামী রাষ্ট্রের মানেই হলো জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র, যেখানে আল্লাহ প্রদত্ত ইনসাফপূর্ণ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষ আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মানবিক সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। সরকার সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের উচ্ছেদ সাধন করবেন। কিন্তু পরিবর্তিত ব্যবস্থাধীনে দেখা গেল, রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ফলে মানুষের ওপর শাসকের অপরিসীম কর্তৃত্ব। কর ধার্য এবং তা উসুল করে দেয়া আর কর্তৃপক্ষের বিলাসী জীবনযাপন ছাড়া রাষ্ট্রের উন্নতি তথা জনকল্যাণ সাধনের কোন নিষ্ঠাপূর্ণ উদ্দেশ্যই আর অবশিষ্ট রইল না।
ইসলামী রাষ্ট্রের জীবনী শক্তি : তাকওয়া বা খোদাভীতি এবং পরকালে নিজ কর্মকান্ডের জবাবদিহিতার অনুভূতি হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি। আর রাষ্ট্র প্রধান ও প্রশাসনযন্ত্রের মধ্যেই হবে প্রথমে তার চরম অভিব্যক্তি। ইসলামের স্বর্ণযুগে সকল কর্মচারী তথা গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র এই প্রাণশক্তি-খোদাভীতি দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু এজিদের হাতে ক্ষমতা আসার পর তার পিতা আমীর মোয়াবিয়ার আমল অপেক্ষা রাষ্ট্র অধিকতর রাজতন্ত্রের রূপ নিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে রোম, পারস্য ও অন্যান্য দেশের সম্রাটদের রীতিমতো চালচলন অনুসৃত হতে থাকলো। ইনসাফের পরিবর্তে জুলুম-নিষণ, তাকওয়ার পরিবর্তে খোদাবিনামুখীনতা; উচ্ছৃংখলতা চরিত্রহীনতা, মদ্যপান অন্যান্য অনৈসলামী কাজ ও বিলাসিতা দেখা দিল। এক কথায়, ইসলামী রাষ্ট্রে শাসনতন্ত্রের যেসব মূলনীতি খোলাফায়ে রাশেদীনের আগ পর্যন্ত অনুসৃত হয়ে আসছিল। পরবর্তী আমলে সেগুলো পরিবর্তিত ও ক্রমশ বিকৃত হতে হতে আজ পর্যন্ত চলে আসছে।
ইসলামী গণতন্ত্র থেকে মুসলিম রাজতন্ত্র : ইসলামী রাষ্ট্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের গণতান্ত্রিক রূপ হলো, মুসলিম জনগণের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির ক্ষমতায় সমাসীন হওয়া এবং জনগণের আস্থা লাভে বঞ্চিত হবার পর জবরদস্তি গদি অাঁকড়িয়ে না থাকা। কিন্তু যে কারণেই হোক, আমীর মোয়াবিয়ার ক্ষমতা লাভের মধ্য দিয়ে সেই রীতির ব্যতিক্রম ঘটার পর মীরাসী সূত্রে শাহী মসনদ দখল করার রীতি শুরু হলো। তারপর খোলাফায়ে রাশেদীনের নির্বাচনভিত্তিক সেই খেলাফতের দিকে মুসলিম জাতি আর প্রত্যাবর্তন করেনি। এ জন্যে যেই প্রচেষ্টা অব্যাহত, তা এখনও নানান কারণে সফলতার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেনি।
ইসলামী গণতন্ত্রের উন্মেষ ও অবসান : ইসলামী শাসনতন্ত্রের একটি ধান হলো, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে পরামর্শের ভিত্তিতে আর পরামর্শদাতাগণ হবে, প্রজ্ঞা, তাকওয়া এবং নির্ভুল ফয়সালার অধিকারী হিসাবে জনসমর্থিত ব্যক্তিবর্গ। খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে যারা মজলিসে শূরার (পার্লামেন্টের) সদস্য ছিলেন, তারা তৎকালীন রীতির ব্যতিক্রম। দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ছিলেন না বটে, তবে স্পষ্টবাদী, স্বাধীন, নিরপেক্ষ, খোদাভীরু, আদর্শবাদী এবং যোগ্য ও মহৎ চরিত্রের লোক হিসাবে জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও মর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন। অন্য কথায় প্রত্যক্ষ ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তারাই মজলিসে শূরায় সদস্য নির্বাচিত হতেন। নিজের বা কারও ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত স্বার্থ সংরক্ষণের মনোভাব বর্জিত এসব ব্যক্তি সকল ব্যাপারে মত প্রকাশ করতেন। মহান খলিফাগণ তাদের মুখ থেকে হক কথা ছাড়া অন্য কিছু আশা করতেন না। কিন্তু খেলাফতে রাশেদার অবসান ঘটার সঙ্গে সঙ্গে মজলিসে শূরার প্রাথমিক গণতান্ত্রিক ধারারও অবসান ঘটলো।
মুসলিম শাসনে ইসলামী আদর্শের বাক-স্বাধীনতা ছিল ইসলামী শাসনতন্ত্রের একটি অন্যতম অবদান। যেমন, একদিন খলিফা ওমর ফারুক (রা.) মসজিদে খোৎবা দিতে গিয়ে যখনই বললেন, আতীউল্লাহ, ওয়া আতীউর রাসূলা ওয়া উলির আমরি মিনকুম ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করো আর আনুগত্য করো তোমাদের নেতাদের’- তখনই এক সাধারণ নাগরিক চট করে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে ওমর ইবনুল খাত্তাব! আপনি যতক্ষণ না এ প্রশ্নের জবাব দিবেন যে,-আমরা সকলে যে পরিমাণ সরকারি কাপড় পেয়েছি আপনিও তাই পেয়ে থাকবেন। কিন্তু তাহলে আমাদের চাইতে আপনারটা লম্বা, এতো লম্বা জামা কোত্থেকে এলো? এ প্রশ্নের জবাব না দিলে আপনার কোনো কথা শুনবো না। জবাবে খলিফার পুত্র আবদুল্লাহ তার ভাগের কাপড়টিও খলিফাকে দেয়াতে এমনটি হয়েছে বলে জানালে প্রশ্নকারী নীরব হয়। হযরত ওমরের মতো রাষ্ট্রপ্রধান ও পরাক্রমশালী ব্যক্তিত্বের কাছে সকলের সামনে প্রশ্ন করতে পারাটা তৎকালীন ইসলামী শাসনামলে বাকস্বাধীনতার এক অনন্য দৃষ্টান্তই তুলে ধরে। খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে এ অদ্ভুত চেতনার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এজিদ জনগণের সেই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়েছেন। অবস্থা এরূপ ছিল যে, মুখ খুললে প্রশংসা করতে হতো নতুবা নীরব থাকতে হতো।
গণসংযোগ : ইসলামী শাসনব্যবস্থায় আল্লাহ ও জনগণের নিকট জবাবদিহির অনুভূতি রাষ্ট্র প্রধানের অবশ্যই থাকতে হবে। এজিদের রাজতন্ত্রের এই সকল কিছুই পরিত্যক্ত হয়। জনগণের অভাব অভিযোগ জ্ঞাত হবার উদ্দেশ্যে তাদের সংস্পর্শে আসার কোনই প্রয়োজন অনুভব করা হতো না।
বায়তুলমাল : ইসলামী শাসনতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বায়তুলমাল। সাহাবায়ে কেরামগণ একটি পাই পয়সাও খেয়ানত করতেন না বা অন্যায়ভাবে খরচ করতেন না, কিন্তু সেই বায়তুলমাল এজিদের নেতৃত্বে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এর আয়-ব্যয়ের কোন হিসাবই কাউকে দেখাবার প্রয়োজনবোধ করা হতো না। একদা রাতের বেলা খলিফা ওমর ফারুকের কাছে জনৈক বিশিষ্ট বন্ধু এসে আলাপ করার সময় তিনি বাতি নিভিয়ে দিলে বন্ধুটি বললেন, এ কেমন হলো? খলিফা বললেন, ব্যক্তিগত আলোচনায় বায়তুলমালের পয়সার কেনা বাতি খরচ করা অবৈধ।
স্বৈরাচার ও জনগণ : সর্বসাধারণ কথাটি এক রকম উঠে যায়। কারও মতের কোন তোয়াক্কা করা হতো না। আল্লাহভক্ত ফকিহগণ এ ব্যবস্থাধীনে বিচারকের পদ গ্রহণ না করায় তাদেরকে বেত্রাঘাত খেতে হয়।
সাম্য-সামাজিকতা : ইসলামী শাসনতন্ত্রের দৃষ্টিতে ভাষা-বর্ণ-গোত্র-অঞ্চল নির্বিশেষে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার কোন তারতম্য থাকতে পারবে না কিন্তু পরিবর্তিত অবস্থায় প্রাক-ইসলামী যুগের যাবতীয় ভেদ-বৈষম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। আরব-অনারব বিদ্বেষের সূত্রপাতও তখন থেকেই শুরু হলো। সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা ব্যথা পাই যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছিল, তা আবার পূর্বরূপ পরিগ্রহ করতে লাগলো।
ভালবাসা আশুরা বা শাহাদাতে কারবালা দিবসের দাবি হলো, ইমাম হোসাইনের আদর্শের অনুসরণে নিজ রাষ্ট্রে খেলাফত আলামিন হাজিন্নবুয়ত তথা নবুওয়াত পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আপোসহীন সংগ্রাম করা।

    Print       Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

You might also like...

বর্ষবরণ উত্সব : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

Read More →